Monday, 3 March 2014

উপাধির উৎস সন্ধানে

বাঙালি ব্রাহ্মণ মূলত রাঢ়ি এবং বারেন্দ্রি। রাঢ়ি এসেছে রাঢ়ভূমি থেকে এবং বারেন্দ্রিরা এসেছে বরিন্দ অঞ্চল থেকে। বরিন্দ বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত থেকে আট কিলোমিটার  মধ্যে অধুনা বাংলাদেশে অবস্থিত। রাঢ়িদের মধ্যে আবার দুই ভাগ আছে যেমন উত্তররাঢ়ি এবং দক্ষিণরাঢ়ি। যেহেতু আবার বাঙলার রাজারা বারবার বাঙলার বাইরে থেকে ব্রাহ্মণদের এ রাজ্যে আমদানি করেছে, সেই ব্রাহ্মণরাও আজ বাঙালি সমাজের অন্তুর্ভুক্ত। বহিরাগত ব্রাহ্মণদের মধ্যে আছে মৈথিলি  ব্রাহ্মণ, যারা বাঙলায় এসেছে মিথিলা থেকে। এঁদের মধ্যে আছে মালদহ  ও বারেন্দ্রভূমি কেন্দ্রিক মিশ্র, ঝা, ওঝা, উপাধ্যায়, তেওয়ারী প্রভৃতি উপাধিধারী। মেদিনীপুরে আছেন এদের মধ্যে আবার কিছু উৎকল ব্রাহ্মণ। বৈদিক ব্রাহ্মণদের আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়পশ্চিম ভারত থেকে আগত পাশ্চাত্য বৈদিক এবং দক্ষিণ ভারত থেকে আগত দাক্ষিণাত্য বৈদিক ব্রাহ্মণরা। কিন্তু কালের প্রবাহে বাঙালির জাতি গঠনের ঐতিহাসিক বিবর্তন স্তরে এরা আজ সবাই বাঙলারই অংশ ও বাঙালি। রাঢ়ী ব্রাহ্মণদের মধ্যে আছে ৫৯ টি এবং বারেন্দ্রীদের মধ্যে আনুমানিক শতখানেক গাঁঞ্জী নামে উপাধি। এই সমস্ত পদবীগুলি পরবর্তিকালে বিবর্তিত হয়েছে আবার বর্তমানে কিছু ব্যবহার হয় না। মৎস্যাশী, তোড়ক, ঝম্পটি,  গোচন্ড, কাছরি ইত্যাদি উপাধি বর্তমানে প্রায় বিলুপ্তির দিকে। কিন্তু এরা সবাই বারেন্দ্র গোষ্টীভূত। বর্তমানে প্রচলিত ও ব্যবহৃত বারেন্দ্রি ব্রাহ্মণ পদবীগুলি হলো বাগচি, লাহিড়ী (লাহিড়ি নামক গ্রাম থেকে আগত), ভাদূড় (উৎস অঞ্চল বা গ্রামের নাম ভাদর বা ভাদুড়িয়া), মৈত্র, আতর্থী (গ্রামের নাম আতথী) ইত্যাদি। অতিমাত্রায় প্রচলিত এবং ব্যবহৃত রাঢ়ি ব্রাহ্মণদের পদবিগুলি হলো চট্টোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায়, বন্দ্যোপাধ্যায়, গঙ্গোপাধ্যায় (গাঙ্গুল গ্রাম থেকে আগত), যেগুলি বৃটিশ কতৃর্ক বিকৃত হয়ে দাড়িয়েছে চ্যাটার্জি, মূখার্জি, ব্যানার্জি বা গাঙ্গুলিতে। চট্টোপাধ্যায়ের আদি উৎস স্থল বর্ধমান জেলার চাটুতি পরগণায় যেখানে এরা পরিচিত ছিলেন চট্টরাজ, চট্ট উপাধিতে এবং এদের মুল পদবি হলো চাটুতি। বন্দ্যোপাধ্যায়দের মূল পদবি বাডুড়ি, এদের মূল উৎস স্থল বীরভূম জেলার বন্দিরহাট পরগনায়। মুখোপাধ্যায়দের উৎপত্তি স্থল বাঁকুড়া জেলার অম্বিকার পরগনার মূখুটি গ্রামে, মূল পদবি মুখুটি। যদিও অনেক ঐতিহাসিক এবং নৃতত্ত্ববিধদের  মতে মুখোপাধ্যায়-এর অর্থ মুখ্য উপাধ্যায়, অর্থাৎ প্রধান পেশা পুজা-পাঠ। আবার অন্য অনেকের মতে কোনো ব্রাহ্মণ যদি অধ্যাপনাও করতেন, তাঁকে গঙ্গ, চট্ট, মূখ্য প্রভৃতি উপাধি মূল পদবীর সাথে সংযুক্ত করা হতো।   গঙ্গোপাধ্যায়দের উৎপত্তিস্থল বর্ধমান জেলার গঙ্গার তীরে । মূল পদবি গাঙ্গুর। স্থানিক উৎপত্তি স্থল ছাড়াও মূল পদবি প্রভাবিত হয়েছে এবং ঐতিহাসিক ভাবে বিকশিত বা বিকৃতি  লাভ করেছে পেশাগত কারণে এবং তার  কালিক বিবর্তনের নিয়মে। উৎসস্থল থেকে উপাধির বুৎপত্তি নিদর্শন পাওয়া যায় আরও। কিছু পদবির উদাহরণ পাওয়া যায় যা পূর্বপুরুষ থেকে আজও পর্যন্ত ব্যবহৃত হচ্ছে। কুশারি পদবি এসেছে কুশ গ্রাম থেকে, গড়গড়ি এসেছে গড়গড়ে গাঁঞী থেকে, কাঞ্জিলাল, স্যান্নাল, দীর্ঘাঙগী (দিঘড়ী গ্রাম থেকে), নন্দী এসেছে নন্দীয়াল গ্রাম থেকে, পালোধি এসেছে পালোধি গ্রাম থেকে ইত্যাদি। সান্যালদের  গ্রামের নাম সণ্ডামিনী।

1 comment:

  1. প্রাপ্ত বা সম্মানিত বা পেশাগত কারণে উপাধি যেমন এসেছে দিল্লির সুলতান, নবাব বা বাদশাহদের কাছ থেকে, তেমনি রাজাদের কাছ থেকে আবার অধুনা বাঙলার বাইরের অন্য কোনো রাজ্য থেকে। পদ থেকে পদবি প্রাপ্তির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে কোচবিহারের রাজবংশ থেকে। কোচবিহারের এমন কিছু স্বতন্ত্র পদবি আছে যা রাজপরিবারের কাছ থেকে প্রাপ্ত এবং তা অবিভক্ত বাঙলার অন্যত্র কোথাও পরযায়ী পেশাগত স্থানান্তরের কারণে কচিৎ-কদাচিৎ পাওয়া যায়। উদাহারণস্বরূপ কিছু পদবি যেমন ঈশোর। কুচবিহারের রাজবংশের কোনো দুহিতার রাজবংশ ছাড়া অনত্র কোনো বংশে বিবাহ হতো, তাঁর গর্ভজাত কুচবিহারের রাজপরিবারের সেই দৌহিত্র সন্তানেরা ঈশোর পদবিতে অলংকৃত হতেন। কার্জি উপাধি দেওয়া হত কুচবিহারের রাজা নয়, এমন কোনো বহিরাগত পরিবারে, বিবাহের পর সেই রাজশ্বশুরকে। এই উপাধি বংশপরম্পরায় এই উপাধি গৃহিত ও সংরক্ষিত হয়েছে। খাজনা আদায় করা বা জমি মাপজোকের সাথে সম্পর্কযুক্ত পেশায় নিয়োজিত গোমস্তাদের কারকুন উপাধি দেওয়া হত। ভিনরাজ্য থেকে আগত মুসলমান রাজাদের দেওয়া মল্লিক উপাধিধারীরা, যারা কুচবিহারের রাজাদের অধীনে কাজ করতেন তাদের পুত্র পৌত্রেরা হতেন গাবুর। রাজকীয় ডাকবিভাগে কর্মরত কর্মচারীদের ডাকুয়া উপাধি দেওয়া হত। রাজবংশের পুরোহিতদের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া হত দেউড়ি পদবি। গ্রামের প্রধান বা মোড়লরা পেতেন ঠাকুরিয়া উপাধি। এসব প্রাপ্ত উপাধি থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যেতে পারে যে কুচবিহারের রাজাদের দেওয়া বহু পদবি আছে যেগুলি পেশাগত কাজে সম্পর্কিত এবং এর অধিকাংশ উপাধি প্রাপ্ত হয়েছে রাজাদের ব্যক্তিগত কাজ থেকে। রাজাদের মাথায় ছত্রধারীদের দেওয়া হতো ছত্রধারী বা ছত্রধরা। রাজাদের প্রাত্যহিক ক্রিয়াদির পর শৌচকার্যে ঝাড়ি দিয়ে যারা জল ঢালতেন তাঁরা হলেন ঝাড়িধরা। যারা পাখায় বাতাস করতেন, তাঁরা হলেন পাখাধরা। রাজাদের ভ্রমণকালে যারা রাজাদের পোশাকআশাকের দেখাশোনা করতেন তাঁরা হলেন পোঁটলাধরা। রাজাদের শয়নকক্ষে যারা বিছানার বন্দোবস্ত করতেন তাঁরা হলেন বোখনাধরা। রাজাদের শিকারে যারা রাজাদের সহায়তা করতেন এবং শিকারে দক্ষতা অর্জন করতেন তাঁরা হতেন পেলান। রাজার রাজদণ্ড ও পাগড়িবহণকারীরা পেতেন সোতাপাগধরা উপাধি। পাগড়ির বিকৃতি হচ্ছে পাগ শব্দ, যেমন পেধা বা দণ্ড ছিল লাঠিসোটার মূল শব্দ। রাজাদের মনোরঞ্জনের জন্য পেশাদার গল্পকারিদের প্রাপ্ত উপাধি হলো গোপ্পি। ত্রিপুরার রাজবাড়ীর স্বাতন্ত্র্য ও সেই রাজবংশে সীমাবদ্ধ হলো মানিক্য উপাধি।

    ReplyDelete