একইভাবে অন্যভাষায় যিনি গ্রামের জনগনের প্রধান বা
বিশেষ হতেন তিনি হলেন গনাই বা বিশী। এরাই
গ্রামের সালিশী সভায় বিবাদের নিষ্পত্তি করতেন এবং নানান সামাজিক সমস্যার বিধান
দিতেন। এখনকার অর্থে অঞ্চলপ্রধান বা
গ্রামপ্রধান। বিভিন্ন সময়ে ভিনজাতি বা ভিনদেশী শব্দ বাঙলা পদবিতে ঢুকেছে। দাম পদবি
গ্রিক শব্দ দ্রম্ম থেকে এসেছে। দ্রম্ম
কথার অর্থ মুদ্রা বা পয়সা। সেই সুত্রে কেউ উপনীত হচ্ছেন ব্যবসায়ী পেশায়। কিছু বিশেষজ্ঞদের ধারণা
প্রাচীনকালে ব্যাক্ট্রিয়ান গ্রিকরা যখন গান্ধার প্রদেশে (বর্তমান আফগানিস্তানের
কান্দাহার) অনুপ্রবেশ করেছিল তখন তাদের
আধুনিক যুগের মুদ্রা তৈরি করার কারখানা ছিল না, তখন মুদ্রা পিটিয়ে তৈরি করা হতো যা
পরবর্তিকালে ছাঁচে ঢ়েলে পয়সা বা মুদ্রা তৈরি করা হত। বাঙালি রাজা বা নবাবরাও
মুদ্রা তৈরির কারখানা বসিয়েছিলেন। এই মুদ্রা তৈরির কাজে যারা নিয়োজিত হয়েছিলেন
তারাই হলেন দ্রম্ম। এই দ্রম্ম পেশা থেকেই কালের প্রবাহে দাম পদবি এসেছে। পূর্ববঙ্গে দাম পদবি রাঢ় বাঙলায় দাঁ হয়ে বিবর্তিত হয়েছে। কয়াল শব্দের উৎপত্তি আরবি শব্দ ‘কাইল’ থেকে। বাজারে দ্রব্য কেনাবেচার মাপজোক
তদারকি করা, অসাধু কারবার ও লোকঠকানো বন্ধ ও নিয়ন্ত্রণ যারা করতেন তারাই ছিলেন
কয়াল। এই কয়ালদের পেশা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ শরিয়তি আইন অনুযায়ী যারা অসাধু
ব্যবসায়ী তাদের দণ্ড হবে। আলাউদ্দিনের জমানায় ফতোয়া জারি হয়েছিল যে যারা লোক ঠকাবে
তাদের দক্ষিন হস্ত কেটে ফেলা হবে। ওয়াদেদ্দার হয়েছে আরবি ‘ওহদেদার’ থেকে। নবাব বা জমিদারকে করপ্রদানে অসমর্থ
ব্যক্তিদের সম্পত্তি বা জমি যারা নিলামে তুলতেন তাদেরই পেশাগত ভাবে ওহদেদার বলা হত। কাঁঠাল পদবির সাথে
কাঁঠাল ফলের কোনো সম্পর্ক নেই। এই পদবিটি কাটাল থেকে বিকৃতি হয়ে কাঁঠাল হয়েছে। নবাব-বাহাদুরদের হুকুমে বিভিন্ন জায়গায় জলকষ্ট
দূর করার জন্য জলাশয়, দীঘি বা পুকুরের খনন কার্যে যারা তদারকি করতেন তারাই ছিলেন
‘কাটাল’ যা পরবর্তিকালে হয়ে দাঁড়াল কাঁঠাল। নবাবের নিজস্ব ব্যক্তিগত সচিব বা
কেরানিকে বলা হত খাসনবিশ। আরবি ‘খাস’ শব্দের অর্থ যারা নবাবদের জমি-জমা, সম্পত্তি
দেখাশোনা ও তদারকি করতেন তাদের বলা হত খাসনবিশ। জানা পদবির উৎপত্তি নবাবি আমলে
ফারসি শব্দ ‘জাহান’ থেকে। এই শব্দের উচ্চারণ রূপ ‘জান’। আর এই জান থেকে বিবর্তিত
হয়ে জানা , যিনি জমিজায়গা দেখাশোনা করতেন। আবার উর্দুতে ‘জান’ এর অর্থ প্রাণ। তোপদারদের পূর্বপুরুষেরা গোলন্দাজ ছিলেন
বা তোপ দাগতেন। শব্দটির উৎস ফারসি। ‘তরফ’ শব্দটি আরবি মানে জমিদারির অংশ। ‘দার’
শব্দটি ফারসি। জমিদারীর এক একটি অংশের যিনি মালিক তিনিই হতেন তরফদার। আরবি শব্দ
‘তৌল্লকু’ থেকে এসেছে তালুক, অর্থে ভূসম্পত্তি। তালুকদার পদবি অবশ্য বাঙলার বাইরেও
আছে। এই পদবি ভূসম্পত্তির সাথে সম্পর্কযুক্ত। সুলতান, নবাব, বাদশাদের দ্বারা যাদের
একটি নির্দিষ্ট ভূসম্পত্তি দান করা হতো, তারাই হলেন তালুকদার। মেদিনীপুরের ঠান্ডার
উপাধি এসেছে ‘থানাদার’ শব্দ থেকে, যারা আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যে পুলিশ চৌকিতে
কর্মরত ছিলেন , চলতি কথায় তারই অপভ্রংশ ঠাণ্ডার। ‘দস্তি’ কথাটা আরবি মানে যারা পেশায় নবাব, সুলতানদের
দলিল, দস্তাবেজ, চিঠিপত্র নিজেদের জিম্মায় রাখতো এবং দেখভাল করতো। সেই অর্থে
দস্তিদার। আরবি ‘ফুত্বহ’ এবং ফারসি ‘দার’, এই দুই শব্দের সমন্বয়ে পোদ্দার কথাটির উৎপত্তি।
এরা তৎকালীন সময়ে নবাব-বাদশাহ বা সরকারী অনুমতিক্রমে সোনারূপা ও মুদ্রার কেনাবেচার সাথে যুক্ত ছিল। সরকারি
চিঠিপত্র ও দলিল গালা দিয়ে বন্ধ করার জন্য চোঙ এর প্রয়োজন ছিল। এই চোঙ যারা সরবরাহ
করতেন তাঁরা হলেন চোঙদার। ‘মজহৌম’ শব্দটি
ফারসি অর্থাৎ মৌজার অধিকর্তা। সুলতান এবং নবাবি আমলে এক বা একাধিক তালুকের খাজনা
আদায়ের ইজারা যাদের দেওয়া হতো তাঁরা হলেন ‘মজমদার’ এবং চলিত কথায় মজুমদার। বিভিন্ন
জাতি ও বিভিন্ন রাজ্যে এই পদবির উপস্থিতি বর্তমান। শিকদার উপাধি দেওয়া হত তাদের যারা খাজনা এবং
রাজস্ব আদায়ের সাথে জড়িত ছিল। গোষ্ঠীভুক্ত মানুষের প্রধান বা প্রতিনিধিকারী ছিলেন
সর্দার। এরা সাধারণের জন্যে কাজ করতেন। ফারসি শব্দ ‘দিওয়ান’ থেকে উৎপত্তি দেওয়ানের। এই উপাধি বাঙালীদের
মধ্যে খুব কম পাওয়া যায়। এরা ছিলেন রাজস্ব
আদায়ের প্রধান কর্মচারী। এরা সুবে বাঙলা
বা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে রাজস্ব আদায়ের সাথে জড়িত ছিলেন। উত্তর ভারতে
হিন্দিভাষী বলয়ে এই উপাধি ব্যাপক সংখ্যায় পাওয়া যায়। ‘পাঞ্জা’ একটি ফারসি শব্দ ,
যেখান থেকে এসেছে পাঁজা। রাজা, নবাব , সুলতান বা বাদশাহদের তরফ থেকে দান-দক্ষিণা
কোনো সরকারী ঘোষণাপত্র যেত সেই ঘোষণাপত্রে আঙুল সমেত হাতের তালুর ছাপ থাকতো কারণ
সেই সময়ে সইসাবুদের বা সিলের প্রচলন ছিল না। যারা এই পাঞ্জার বলে দানগ্রহীতা,
তাঁরাই হলেন পাঁজা। ‘মালিক’ শব্দটি ফারসিজাত, যার অর্থে সে ব্যক্তিকে নবাব, বাদশাহরা
সম্মানিত করতেন। এই মালিক শব্দটি অপভ্রংশ হয়ে হল মল্লিক। এই মল্লিক বা মালিক উপাধি
দেওয়া হত প্রধানত পাঠান আমলে, যারা বিশেষ করে জমি-বা জায়গীর দান হিসেবে পেতেন। ‘মালিক’ উপাধি অধুনা পাকিস্তনেও পাওয়া যায়। আরবি ‘মহল্ল’ শব্দের অর্থ
নগর। বর্তমানে মহল্লা শব্দের অর্থ পাড়া। মুঘল আমলে মহলানবিশ পদবিটি এসেছে, যারা
প্রধানত নগরের বিভিন্ন সরকারি লেখালেখির কাজ করতেন। মুন্সি শব্দটা ফারসিজাত, অর্থে
কেরানী। মুঘলযুগে যারা আদালতে বা অন্যত্র কেরানীর কাজ করতেন, তাঁরা ছিলেন মুন্সি।
এই পদবি বাঙালা বাদ দিলেও সমগ্র উত্তর ও পশ্চিম ভারতে আছে। একইভাবে ‘মুস্তাফি’ শব্দের ফারসি অর্থ পরীক্ষক (অধুনা - auditor)। এরা রাজস্ব সম্বন্ধীয় হিসাব পরীক্ষা করতেন।
ফারসি ‘লস্কর’-এর অর্থ পদাতিক সৈন্য বা সৈনিক বিভাগের কর্মী বা জাহাজের কর্মী
হতে পারে। পাঠানদের আমলে এই উপাধি দেওয়া হত। নস্কর হচ্ছে লস্করের বিকৃত বা
বিবর্তিত রূপ। মুঘল আমলে ‘হাজার’ মানে হাজার সৈন্যের অধিপতি। বাঙলায় তা হাজরা,
উত্তরভারতে হাজারি, পশ্চিমভারতে হাজারে আর অসমে হাজারিকা। বাঙলাতে সমস্ত বর্ণে এবং
উপবর্ণে এই পদবি পাওয়া যায়। সাহা হচ্ছে সাহূর অপভ্রংশ এবং প্রকৃতপক্ষে সাধুর
অপভ্রংশ। সাধু শব্দের নানান অর্থের মধ্যে পড়ে বনিক বা ব্যবসায়ী। বাঙলায় সাহা,
বিহার ও উত্তরপ্রদেশে সাহূ, সিন্ধূপ্রদেশে সাহানা, দিল্লি, পশ্চিমভারতে এবং
মধ্যপ্রদেশে সাহানী, একই পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন, অর্থাৎ ব্যবসা, বনিক বা
ব্যবসায়ী। বাঙলায় গোস্বামী অসমে গোঁহাই, বড়ো গোস্বামী হয়ে যায় বড়ো গোঁহাই। সংস্কৃত
পটকিল পশ্চিমভারতের গুজরাতে প্যাটেল, মহারাষ্ট্রে পটেল ও বাঙলায় পটল। দাস পদবির
দুটি অর্থ আছে। দাস মানে সেবক বা ভৃত্য, আর দাশ শব্দের অর্থ মহাপণ্ডিত। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নর্ডিক আগ্রাসীরা
এদেশের আদিম অধিবাসীদের দাস বা দস্যু হিসেবে অভিহিত করতেন, এদের মধ্যে যারা মহাবলি
বা শক্তিধর বা মহাপরাক্রমশালী তাদের অসুর হিসেবে অভিহিত করা হত। সেতুয়া উপাধিধারীরা
সেতু নির্মানে পারদর্শী ছিলেন। উৎকলে এই
উপাধি পাওয়া যায়। গাইনরা রাজা বা সামন্ত জমিদারদের দরবারের গান গাইতেন আর বাইন-রা নানান বাজনা বাজাতেন। এই দুই উপাধি অপভ্রংশ বা
বিকৃত হয়ে বায়েন এবং গায়েন হয়েছে। গুপ্ত পদবির সাথে গোপনীয়তার কোনো সম্পর্ক নেই।
এই পেশা প্রধানত মধ্যসত্বভোগী। এরা রাজার বা সামন্ত জমিদারদের হয়ে কৃষকের কাছ থেকে
ফসলের দেয় অংশ কর আদায় করতেন। হাটি বা হাটুই সমার্থক। সংস্কৃততে হাটির বুৎপত্তি হট্টারিক থেকে। অর্থাৎ যারা হাটে
ব্যবসা করতেন তাঁরাই প্রধানত হাটি। এরই অপভ্রংশ হাতি পদবি। হাতির আরো অপভ্রংশ হলো
আড্ডি বা আড়ি। যারা ব্যবসা, বানিজ্য থেকে ধনলাভ করেছেন তাঁরা হলেন ধনাঢ্য। এই
ধনাঢ্য থেকে আঢ্য, আঢ্য থেকে আড্ডি বা আড়ি। ব্যবসা বানিজ্যে পুঁজি এবং লভ্যাংশের অর্ধভাগের যারা অধিকারী হতেন তাঁরা হলেন আদক। করণিক থেকে এসেছে করণ। মূলত মেদিনীপুরে অনেকেই এই পদবিধারী।
অর্থাৎ পেশায় রাজার কেরানি। ঘরামিরা সাধারণত
গাঁ-গঙ্গে ভেঙ্গে যাওয়া ঘর পূনর্নির্মান বা নতুন ঘর নির্মান পেশায় যুক্ত ছিলেন। বাগেদের কাজ ছিল বাগ বা বাগান বা বাগিচা নির্মান
ও দেখভাল করার। নাগ পদবির অর্থ সাপ। এই পদবি আমাদের প্রাচীন গোত্রসুত্রে টোটেম বা
ট্যাবু গোষ্ঠী (যেমন কচ্ছপ থেকে কাশ্যপ) সাঁওতাল, ওঁরাও, মুণ্ডাদের মতন
বর্ণহিন্দুদের মধ্যে আছে। বেসরা অর্থে গোসাপ, এই পদবি বহুল প্রচলিত। আদিত্য
পদবি বহুল প্রচলিত, এর থেকে বিকৃত হয়ে এসেছে আইচ। দুটো শব্দের অর্থ এক, মূলত
সুর্যের উপাসক। চন্দ্রের উপাসক হলেন চন্দ্র, অপভ্রংশে চন্দ। পশ্চিমভারতে পদবিটা
চাঁদ বা চাঁন্দ। বর্ধমানে বিষ্ণু প্রধানত বিষ্ণুর উপাসক। উপাসনা বা পূজা গোছগাছ
যারা করতেন তাঁরা হলেন গুছাইত। কুন্ডু শব্দটির মূল উৎস দ্রাবিড় ভাষায় কুন্ডা থেকে।
এই পদবি প্রধানত প্রটো-দ্রাবিড় রক্ত
শংকরের সাক্ষ্য বহণ করে। বল্লাল সেনের আমলে পাঁচঘর কায়স্থকে কনৌজ থেকে বাঙলায় আনা
হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিল গুহ। এই পদবির সাথে গুহাবাসীর কোনো সম্পর্ক নেই। এরা
ছিলেন আদি যুক্তপ্রদেশের বাসিন্দা। দত্ত, বসুরাও এসেছিলেন কনৌজ এবং পাঞ্জাব থেকে। ব্রাম্মণদের
মধ্যেও পেশাগত কারণে পদবির উৎস প্রতীয়মান হয়। যজ্ঞের প্রধান পুরোহিত বা প্রধান
অধ্যাপককে, অর্থাৎ অধুনা প্রিন্সিপাল,
তাঁর প্রাপ্ত উপাধি ছিল আচার্য। যে ব্রাহ্মণ রাজপরিবারের পূজা-অর্চনা, গুনকীর্তন বা তোষামোদি হতেন তিনি লাভ করতেন ভট্ট। আবার এই
ভট্টই যখন অধ্যাপনার কাজে লিপ্ত হতেন, তখন তিনি উপাধি লাভ করতেন ভট্টাচার্য্য।
অবশ্য বন্দ্যোপাধ্যায় ব্রাহ্মণদের মধ্য
থেকে পেশাগত কারণে প্রাপ্ত উপাধি। এই আচার্যরা ছিলেন ব্রাহ্মণদের শ্রেনী বিন্যাস
স্তরে একদম উচ্চে অবস্থিত। এদেরই কেউ কেউ আবার যখন যাগ-যজ্ঞাদি, অধ্যাপনার কাজ ছেড়ে, পরবর্তিকালে জীবিকার তাগিদে
বর্ণ-শ্রেনী বিন্যাসে নিম্ন স্তরে বৈশ্য বা ক্ষত্রিয়ের পেশা অবলম্বন করতেন তখন
তাদের উপাধি নিতেন আচার্য চৌধুরি। উদাহরণস্বরূপ
মৈমনসিংহের রাজাদের, স্নেহাংশুকান্ত আচার্য্য চৌধুরিদের পরিবার।
গ্রিক শব্দটি হ'লো Drachhma যা গ্রিসের মুদ্রার অপর নাম।
ReplyDelete