Monday, 3 March 2014

উপাধির উৎস সন্ধানে ৩

গৌড়ের সুলতান সামসুদ্দিনের রাজত্বকালে ত্রিপুরার রাজাদের এই উপাধিতে ভূষিত করা হয়। বিভিন্ন বর্ণ-উপবর্ণতেও  প্রাপ্ত উপাধির নিদর্শন পাওয়া যায়। ঠাকুর উপাধি যেমন রাজাদের কর্তৃক প্রাপ্ত আবার জনগনের তরফ থেকেও দেওয়া হত। কবিগুরুর পূর্বপুরুষের আদি উপাধি ছিল কুশারি। এরা সাধারণত নিম্নবর্ণের পূজাপাঠ করতেন। সেই সুবাদে জনসাধারণ তাদের ঠাকুর উপাধিতে সম্মানিত করতো। সেই  থেকেই এই পদবির পরিবর্তিত পদবি ঠাকুর। সরকার পদবি বিভিন্ন জাতি-উপজাতিতে পাওয়া যায়। এই উপাধি ব্রাহ্মণ থেকে নিম্নবর্ণের মধ্যে পাওয়া যায়। শেরশাহ তাঁর শাসনকার্যের সুবিধের জন্য সরকারকে বিভিন্ন পেশাভিত্তিক শ্রেণীতে ভাগ করলেন। যারা তাঁর সরকারের কর্মচারী ছিলেন, তাঁরা হলেন সরকার। অর্থাৎ শেরাশাহ সরকারের প্রতিনিধি। এর ফলে বিভিন্ন জাতি ও বর্ণে সরকার উপাধি থেকে গেলো এবং বংশপরম্পরায় চলে আসল। সরকার শব্দের বুৎপত্তি ফারসি শব্দ ‘শরকার’ থেকে। বর্তমানে উত্তরভারতে হিন্দিভাষী এলাকাগুলিতে সরকারি কর্মচারিদের ‘সরকার’ দ্বারা সম্বোধিত করা হয়। কানুনগো পদবি শুধুমাত্র বাঙলার বিভিন্ন বর্নে বা উপবর্ণে পাওয়া যায় না, এই পদবির বিস্তৃতি বাঙলা থেকে গুজরাট অবধি। কানুনগো শব্দের বাঙলায় মানে আইন, এর সাথে ‘গো’ যোগে জ্ঞানকারী। এই পদবিও মুঘলসাম্রাজ্যের সময় থেকে প্রাপ্ত  ও প্রচলিত। বিশ্বাস পদবিও বিভিন্ন বর্ণ ও উপবর্ণে পাওয়া যায়। এই পদবি হিন্দুরাজাদের থেকে সুলতান, পাঠান এবং মুঘল আমলেও প্রচলিত ছিল। বিশ্বস্ত রাজকর্মচারী থেকে বিশ্বাস পদবি প্রাপ্ত। এই পদবি যেমন বর্ণ হিন্দুদের মধ্যে আছে তেমন আবার বাঙালী মুসলমানদের মধ্যেও পাওয়া যায়। পণ্ডিত প্রাপ্ত পদবি। যিনি শাস্ত্রবিশেষজ্ঞ তিনি এই উপাধিতে ভূষিত হতেন রাজাদের, সামন্ত জমিদার বা সাধারণ মানুষের দ্বারা। মূর্খ হলেও বংশপরম্পরায় এই উপাধি বহন করেন এরা। সিকদার, আমীন, খান, মুন্সি, পাইক, হালদার, লস্কর, মৃধা, চৌধুরী, রায়চৌধুরী, মণ্ডল প্রভৃতি পদবি হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান নির্বিশেষে বিভিন্ন বর্ন-উপবর্ণে পাওয়া যায়। খাঁ উপাধি পাঠান আমলে প্রাপ্ত হলেও ইংরাজের আমলে খাঁ অপভ্রংশ হয়ে হল খান। পাঠানদের আমলে নবাবদের প্রিয়পাত্র হিন্দু –মুসলমান নির্বিশেষে খাঁ উপাধিতে ভূষিত করা হত। নিয়োগী-রা হিন্দু রাজাদের সময় থেকে রাজকার্যে উপযুক্ত কর্মচারী নিয়োগ করতেন। পাঠানদের আমলে রাজস্ব আদায়ের কাজে যারা নিযুক্ত থাকত তাদের প্রাপ্ত উপাধি ছিল সিকদার। মৃধা শব্দের বুৎপত্তি নবাবদের কামান মিরদাহ থেকে। বিষেনপুরের রাজা নবাবদের ঐতিহাসিক কারণে প্রিয়পাত্র হবার সুবাধে এই কামানের নমুনা পেয়েছিলেন। বিষেনপুরে হিন্দু রাজাদের আমলে এই কামানের গোলাইয়ের কাজে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে যে সব শ্রমিক নিয়োজিত  হত এবং দক্ষতা অর্জন করেছিল তারা এই উপাধি পেষাগত কারণে পেয়েছিলো। আবার অনেক বিশেষজ্ঞদের  মতে যুদ্ধে নিয়োজিত পদাতিক সৈন্যদের উপাধি ছিল মৃধা। মণ্ডল এমন এক পদবি যা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে, জাতি-উপজাতি, বর্ণ-উপবর্ণে , ধর্মে ব্যাপৃত। মণ্ডলের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ গ্রামের প্রধান ব্যক্তি। ভারতবর্ষের সুদূর  অতীত থেকে জনগনের মূল জীবন ছিল গ্রামীণ জীবন। গ্রামের প্রধানকেই  তাই জনগন মানত, সাম্রাজ্যের হস্তান্তর সাধারণত মানুষের গ্রামীণ জীবনকে প্রভাবিত করত না। অবশ্য ইংরেজ কোম্পানীর  সাম্রাজ্যে উপনিবেশের সুত্রপাত থেকে এই প্রস্তরীভূত গ্রাম্য আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে। সে যাবৎকাল   অবধি মণ্ডলই ছিলেন গ্রামের সর্বেরসর্বা , মান্যগন্য ও অভিভাবক। এদের গ্রাম্য ভাষায় মণ্ডলপতি বা মণ্ডলেশ্বর হিসেবে অভিহিত করা হত।  এদের সঙ্গে যে রাজপ্রতিনিধি যোগাযোগ রাখতেন তিনি হলেন মাণ্ডলিক বা মহামাণ্ডলিক। মণ্ডলপতি বা মণ্ডলেশ্বর চলিত ভাষায় হয়ে গেলেন মণ্ডল বা মোড়ল। 

No comments:

Post a Comment